৪৬০ মিনিট আগের আপডেট; রাত ৮:৫৮; বৃহস্পতিবার ; ০১ অক্টোবর ২০২০

কক্সবাজারে পিবিআই’র জমি অধিগ্রহণে বড় কেলেঙ্কারী

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৩ অগাস্ট ২০২০, ১১:৪৮

কক্সবাজারের কলাতলীর ঝিলংজা মৌজায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন (পিবিআই) ও সিআইডির অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে নানা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরকারি এসব টাকা লোপাটে গড়ে তোলা হয় ৩/৪ জনের একটি সিন্ডিকেট। বিপুল অঙ্কের এ টাকা আত্মসাতে সিন্ডিকেট সদস্যরা এতই বেপরোয়া ছিল যে খোদ আদালতে মামলা থাকলেও তা পাত্তা দেননি। এমনকি কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে দায়ের করা একাধিক অভিযোগকেও আমলে নেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

এভাবে কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়ে সটকে পড়েছেন ইলিয়াছ ব্রাদার্সের পক্ষে এডভোকেট নেজামুল হক, চন্দ্রিমা বহুমুখী সমবায় সমিতির পক্ষে কক্সবাজার শহরের কলাতলী সৈকতপাড়ার মৃত সোলতান আহমদের পুত্র মোহাম্মদ ইদ্রিছ সিআইপি, ইদ্রিছ সিআইপির স্ত্রী জিন্নাত রেহেনা, ঈদগাও এলাকার এডভোকেট নুরুল হক (বর্তমানে বাহারছড়া), নুরুল হকের স্ত্রী শাওরীন জাহান, মহেশখালীর বেলায়েত হোসেন, নাছির উদ্দিনসহ সিন্ডিকেটের সদস্যরা। যার কারণে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে এনেছেন এক ভূক্তভোগী। এছাড়া আদালতে উঠেছে আরও কয়েকটি মামলা। 

দুদকে দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঝিলংজা মৌজার বি.এস ৫৭২ নং খতিয়ানের বি.এস ২০৩০৬ দাগ থেকে ১৯৯১ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ১৩/৯১-৯২ নং মামলা মূলে ০.৮৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে। সওজ এর ট্রেসম্যাপ অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত জমি বাদে রাস্তার দক্ষিণ পাশে ০.০৯ একর জমি অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে মূল তথ্য গোপন করে রাস্তার দক্ষিণ পাশে বি.এস ২০৩০৬ দাগ থেকে ০৪/২০১৮-১৯ ইং মামলা মূলে ০.১৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়।

এভাবে ০.০৯ একর জমির অস্থিত্ব না থাকলেও তা অতিরিক্ত অধিগ্রহণ করে সরকারের বিপুল অঙ্কের টাকা আতœসাৎ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, অধিগ্রহণকৃত ০.১৮ একর জমির মধ্যে ০.০২ একর জমির বি.এস ১২৩৩৬ নং খতিয়ানটিই বাতিল। ওই বাতিল খতিয়ান দেখিয়েই জমির ক্ষতিপূরণের টাকা নেয়া হয়েছে। এছাড়া রাস্তার দক্ষিণ পাশে যে ০.০৯ একর জমি রয়েছে সেখানে ০.০৫ একর জমির মালিক মোহাম্মদ ইলিয়াছ সওদাগর বলে দাবি করেন। 

তিনি ওই জমি অধিগ্রহণে তার নামে রোয়েদাদ প্রচার না করে ভিন্ন নামে প্রচার করায় উচিত প্রতিকারের জন্য কক্সবাজার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে অপর ২৪৯/১৯ নং মামলা এবং প্রতিপক্ষ ইলিয়াছ ব্রাদার্সকে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান না করার জন্য ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ বরাবর আপত্তি দাখিল করেন। কিন্তু মামলা থাকা স্বত্তেও দাখিলকৃত আপত্তির কোন শুনানী না করেই গোপনে প্রতিপক্ষ ইলিয়াছ ব্রাদার্সের পক্ষের লোকজনকে ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদান করা হয়। রাস্তার দক্ষিণ পাশে যে ০.০৯ একর জমি রয়েছে সেখানে ০.০২ একর জমির স্বত্ত দখল রয়েছে দাবী করে মামলা করেন সেলিম রেজা গং। 

শুধু তাই নয়, কক্সবাজার শহরের কলাতলী ঝিলংজার মৃত হাজি ছালেহ আহমদের পুত্র মফিজুর রহমানের নামে এল.এ ০৪/২০১৮-১৯ ইং হুকুম দখল মামলা মূলে ভূমি অধিগ্রহন শাখা থেকে ১১/০৯/২০১৯ ইং তারিখে ভূমি হুকুম দখল আইনের ৮(৩) ধারামতে নোটিশ প্রদান করা হয়। কিন্তু ইদ্রিছ সিআইপি, নুরুল হক ও বেলায়েতের নেতৃত্বে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট এর সাথে ভূমি অধিগ্রহন শাখার অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে জমির স্বত্ব দখলদার মফিজুর রহমানকে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে গড়িমসি করেন। এক পর্যায়ে ভূমি অধিগ্রহন শাখা থেকে মফিজুর রহমানকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। যার কারণে মফিজুর রহমানও আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। 

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিন্ডিকেটটি এতোই শক্তিশালী যে কোভিড-১৯ এর কারণে লকডাউন চলাকালীন সময়ে অতিগোপনে ভূমি অধিগ্রহন শাখার অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে পূর্বের তারিখ দিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকার চেক তুলে নিয়েছেন। চেকের তারিখ, ট্রেজারি, সোনালি ব্যাংক ও স্ব স্ব ব্যাংকের তারিখ পর্যালোচনা করলে তা বেরিয়ে আসবে। এমনকি ভূমি অধিগ্রহন শাখার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেকের স্বাক্ষর নিয়েছেন সিন্ডিকেট সদস্যদের বাসা ও হোটেলে গিয়ে।

এভাবে এডভোকেট নুরুল হকের নামে দুই দফে ১১৩৫৪১০২ টাকা ও ১০৮৫০৫১৪ টাকা, বেলায়েত হোসেনের নামে দুই দফে ১৪৯৭৯৪৭০ টাকা ও ১০৮৫০০০০ টাকা, এডভোকেট নেজামুল হকের নামে ৫২৪৯১৯৮৭ টাকা, ইদ্রিছ সিআইপির নামে ৫ দফে ৩১৭৭৩৫১ টাকা, ১৯১২৩৮৯ টাকা, ৮৯১৫২৩০ টাকা, ৭৭৪৭৭৫৯ টাকা ও ৩১২৫৬৫৫ টাকা, ইদ্রিছের স্ত্রী জিন্নাত রেহেনার নামে ৩ দফে ৭০৭৫৫৭০ টাকা, ১৯৬৪৫৭০৩ টাকা ও ১৫৬০১৬৫৩ টাকা, মিজানুর রহমানের নামে ২ দফে ৪৩৯৩৭৭ টাকা ও ৭৬৮৫৯৭২ টাকা, নাছির উদ্দিনের নামে ৫২৩৩০৭৩ টাকা, শাওরিন জাহানের নামে ১৪২১৪৯৩২ টাকাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে-বেনামে আরও বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে নেয়া হয়।

অথচ এদের অনেকের নামে ভূমি অধিগ্রহন শাখা থেকে নোটিশ ইস্যু হয়নি। নামে-বেনামে তুলে নেয়া অধিকাংশ টাকা জমা হয়েছে ইদ্রিছ সিআইপি ও এডভোকেট নুরুল হক এর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে। এছাড়া পিবিআই এর জমি অধিগ্রহন নিয়ে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট এর আরও ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে আসছে।


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ১৩২৭