৯১ মিনিট আগের আপডেট; রাত ২:০৪; বৃহস্পতিবার ; ১৩ অগাস্ট ২০২০

মোবাইল ব্যবহার নিয়ে কিছু কথা

ওসামা বিন আমিন ২৭ জুলাই ২০২০, ২৩:১২

সমাবেশে, গণপরিবহনে, হসপিটালে, সম্মানি মানুষদের সামনে বা অন্যান্য পাবলিক প্লেইসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইলে উচু আওয়াজে কথা বলা, খুব গর্হিত কাজ। যদি একান্ত প্রয়োজন হয় অনুমতি নিয়ে এক পাশে গিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে প্রয়োজনীয় কথা শেষ করাই শ্রেয়। যেখানে মানুষকে কষ্ট দিয়ে ইবাদাত করা নিষেধ, সেখানে আমরা এই কাজগুলো কীভাবে করি? এটা খুবই দুঃখের বিষয়!

হাদিসে এসেছে, ‘এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.) অমুক মহিলা বেশি বেশি নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং দান-সদকা করে; কিন্তু সে তার প্রতিবাশীকে গালমন্দ করে এবং কষ্ট দেয়। রাসুল (সা.) বললেন, এমন মহিলা জাহান্নামে যাবে। লোকটি পুনরায় বললেন, তমুক মহিলা নামাজ-রোজা কম করে এবং অল্প পরিমাণে দান-সদকা করে; তবে সে তার প্রতিবেশীকে গালমন্দ করে না এবং কষ্ট দেয় না। রাসুল (সা.) বললেন, সে জান্নাতে যাবে।’ (মুসনাদে আহমদ : ২/৪৪০; মুসদারাক হাকেম : ৪/১৬৬)।

উক্ত হাদিস থেকে বুঝা যায়, পার্শ্ববর্তী মানুষকে কষ্ট দেয়া কখনো ইসলাম সামর্থন করেনা। এমনকি এটাও তার জাহান্নামের কারণ হতে পারে।
 প্রসঙ্গত আমরা রাতের গভীরে ৩০-৪০ টা মাইক লাগিয়ে গলা ফাটিয়ে ওয়াজ করি, জিকির করি, দরুদ পড়ি। এতে গোনাহ হয় না সওয়াব হয় আমার খুব বেশি সংশয় আছে। অসুস্থ মানুষ, বৃদ্ধ ও শিশুদের খুব কষ্ট হয় শব্দের কারণে, এর ফলে মহিলারা ঘরে নামাজ পড়তে পারেন না মনোযোগ সহকারে। তাই ওয়াজ আয়োজকদের এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত এবং রাত ১১ টার মধ্যে ওয়াজ মাহফিল শেষ করে দেওয়া উচিত। এই বাজে কালচার থেকে আমাদের বের হয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে।

সর্বজনীন জায়গায় মোবাইল ব্যবহারের পদ্ধতি:
গাড়িতে বা যেকোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্টে বসে মোবাইলে উচু ভলিউমে গান বাজনা শোনা, সঙ্গীত, ওয়াজ শোনা এগুলো খুবই গর্হিত কাজ। আপনার হয়ত কোন একজন বক্তাকে ভালো লাগে, অপরের তাকে ভালো নাও লাগতে পারে। শিশুরা গাড়িতে ঘুমায়, অসুস্থ মানুষ থাকে তাদের ডিস্টার্ব কেন করবেন? গাড়িতে শত রকমের মানুষ থাকে। আপনার হয়তো ভালো লাগছে, অন্য জনের খারাপ লাগতে পারে,  আপনি তো তাকে কষ্ট দিতে পারেন না।
আপনার যদি খুব বেশি শুনতে ইচ্ছে করে তবে হ্যাডফোন লাগিয়ে শুনতে পারেন।
আর একটা বিষয়, হ্যাডফোন কানো লাগানো অবস্থায় কারো সঙ্গে কথানা বলা উচিত। কথা বলতে হলে হ্যাডফোন খোলে কথা বলা উচিত। অনেকেই কানে হ্যাডফোন লাগিয়ে  হয়ত কিছু শুনছে,  এমন সময় অপরের সাথে কথা বললে, কথা না বুঝে উল্টো  চিৎকার করে কথা বলে ফেলেন। এটা ভালো আচরণ নয়।এটা বর্জন করা খুবই জরুরি।

কাউকে কল দেয়ার পদ্ধতি:
যদি একান্ত ইমার্জেন্সি প্রয়োজন  না হয় তবে-
১. একবারের বেশি দুইবার কাউকে ফোন দেওয়া অনুচিত। মিসকল দেখে হয়ত তিনি ফোন করবেন। না হয় আপনি অন্য কোনো সময় ফোন দিন।
২. রাত বিরেতে ফোন দেওয়া খুবই অনুচিত। বিশেষ করে রাত ১০ টার পর জরুরি প্রয়োজন ব্যতিত কাউকে ফোন দেয়া কখনো৷ কাম্য নয়।
৩.অনেক মানুষ তাহাজ্জুদ পড়ে ফজর পড়ে তবেই ঘুমান। তাই খুব ভোরে মানুষকে ফোন দেয়া অনুচিত।
৪. জোহরের নামাজের পর ফোন না দেয়া। অনেকেই এই সময় একটু বিশ্রাম নেন।
৫. আজান হবার পর থেকে অন্তত ৩৫-৪০ মিনিটের ভেতরে কোন পুরুষ যারা মসজিদে যায় তাদের ফোন না দেয়া।

নামাজের সময় মোবাইলে কল আসলে করনীয়:
নামাজের সময় বুঝে তবেই ফোন করতে হবে। নামাজী মানুষ কখন নামাজে থাকেন তা আমরা জানি। এটা মাথায় রাখা জরুরি। অনেকেই ভুলে মোবাইল সাইলেন্ট না করে মসজিদে প্রবেশ করেন। জামাত চলাকালীন সময়ে অনেকের ফোন বাজতেই থাকে। যদি এমন হয়েই যায়, তবে নামাজরত অবস্থাতেই এক চাপে কল কেটে দেবেন৷ কারণ নামাজরত অবস্থায় আপনার মোবাইলের শব্দের কারণে অন্য  অন্যদের খুব অসুবিধা হয়। এটা খুবই বিব্রতকর। তবে নামাজে দাঁড়ানোর সময় উচিত হলো, মোবাইল বন্ধ করে নামাজে দাঁড়ানো বা মসজিদে প্রবেশ করা এটা একটা নিয়মিত প্র্যাকটিসের বিষয়। খুব সতর্ক থাকা উচিত এই বিষয়ে।

যেমন ফতুয়ার কিতাবে এসেছে,-যদি ভুল করে করে কেউ ফোন বন্ধ না করেন কিংবা সাইলেন্ট না করেন নামাজে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে কল আসলে তিনি এক হাতে এবং মোবাইলের দিকে না থাকিয়ে ফোন বন্ধ কিংবা কল কেটে দেবেন। আর যদি এক হাত দ্বারা বন্ধ করতে গিয়ে মোবাইল পকেট থেকে বের করে দেখা লাগে , তখন অবশ্য বন্ধ করার জন্য বাটন দেখার প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রে বাটন দেখে দ্রুত বন্ধ করা যাবে। এ কারণে নামাজ নষ্ট হবে না। তবে কার কল আসল তা ইচ্ছাকৃত দেখলে নামাজ মাকরুহ হবে। কেননা নামাজ অবস্থায় কোনো লেখা দেখা এবং বোঝার চেষ্টা করা মাকরুহ। তাই এ থেকে বিরত থাকা জরুরি। (আলমুহীতুল বুরহানী ২/১৫৯;শরহুল মুনইয়া,পৃ.৪৪৭;আদ্দুররুল মুখতার ১/৬৩৪,৬২৪)

কল রিসিভ করে কথা বলার আদব:
কোনো কল আসলে ফোন ধরেই সালাম দিতে হয়। অনেকেই অপর পাশ থেকে সালামের জন্য অপেক্ষা করেন। এটা অনেকটা অহংকারের লক্ষণ।
 বিশ্বনবি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :
الْبَادِئُ بِالسَّلَامِ بَرِيءٌ مِنَ الْكِبْرِ
অর্থঃ- যে আগে সালাম দেয় সে অহংকার থকে মুক্ত। ( বায়হাকীঃ- ৮৪০৭)

অনুমতি ব্যতিত অন্যের মোবাইলের দিকে না দেখা:
কারো মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা অনুচিত, যদি না মোবাইলের মালিক আপনাকে দেখান।
বিশেষ করে গাড়িতে এই কাজ বেশি হয়।  এগুলো কখনো ইসলাম সামর্থন করেনা। এ বিষয়ে সকর্ত থাকা জরুরি।কারো মোবাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করা, ম্যাসেজ পড়া খুবই অনুচিত। এটা মানুষের প্রাইভেসি লংঘন করে।কারো চিঠি খোলে পড়ে নেয়ার মতই গোনাহের কাজ এটা।
অন্যের চিঠি দেখার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে- "একজন যখন তার ভাই এর  চিঠিতে  অনুমতি ছাড়া নজর দেয়, সে যেন জাহান্নামের আগুন দেখছে" (আল-সুয়ুতি, আল জামি ’আস-সাগির, পৃ ১৬৫;  ইবনে মাজাহ, আল-আদাব আল-শারিয়া, দ্বিতীয়, ১৬৬)।
অনেক সময় মোবাইল মালিক চক্ষু লজ্জায় কিছু বলতে পারেন না ৷ কিন্তু মনে মনে অনেক বিরক্ত হয়।
তাই আমরা অন্যের মোবাইল, কম্পিউটার ইত্যাদির দিকে তাকিয়ে তার গোপন বিষয় দেখার চেষ্টা করে জাহান্নামের কাজ করবোনা ইনশাআল্লাহ।

আপনার মোবাইলে কারো  একাউন্ট লগ ইন করা থাকলে করনীয়:
কোনো ইমার্জেন্সি কাজে অপরের মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাব ইত্যাদি ব্যবহার করে ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপে, ইনস্টাগ্রামে, ভাইবারে, টুইটারে কিংবা ফেসবুকে গেলে অনেক সময় লগ আউট করতে ভুলে যান অনেকেই। সেই সুযোগে ঐ মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাবের মালিকের কোনোভাবেই উচিত না, তার ফেসবুকে প্রবেশ করা। আপনার  উচিৎ হবে তার সেই একাউন্ট লগ আউট করে দেয়া।

তিনি হোন আপনার যতই ঘনিষ্ঠজন। তবে টিনএইজ বাচ্চাদেরকে বা শিশুদেরকে ফেসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেয়া উচিত না। যদি তারা একান্ত ব্যবহার করেই তবে নিয়ন্ত্রণে রেখে কঠিন মনিটরিংয়ে রাখা উচিত মা বাবাদের। কেননা, বর্তমানে  শিশুদের ভুল পথে চলে যাওযার সকল রসদ ইন্টারনেটে বিদ্যমান। তাই  শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে দূরে রাখা খুবই জরুরি। পিতা মাতার অসতর্কতার কারণে বর্তমানে হাজার হাজার কিশোর ভুল পথে চলে যাচ্ছে।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মোবাইল ব্যবহারে নৈতিক পদ্ধতির অভাবের কারণে বর্তমানে অনেক ঘনিষ্ঠ মানুষের সাথেও সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় এবং এটা আপনার ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ণ করে। তাই আমাদের  উচিৎ সব দিকে লক্ষ রেখে নিজেকে পরিচালিত করা। বিনা প্রয়োজনে সম্মানিত ব্যক্তিদের সামনে মোবাইল ঘাটাঘাটি না করা একান্ত প্রয়োজন। আর মোবাইলকে ভালো কাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের জান্নাতের পথ সহজ করার তৌফিক দান করুক- আমিন।    

লেখক:

শিক্ষার্থী,

চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসা


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ১৩৩