৩ মিনিট আগের আপডেট; রাত ২:৫০; শনিবার ; ৩০ মে ২০২০

বাবার স্মৃতি

সাজ্জাদুল করিম ১৪ অগাস্ট ২০১৯, ১৫:৫২

বাবা কেবল একজন মানুষ নন, বাবা কেবল একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের মায়াবী প্রকাশ। বাবা নিঃস্বার্থ এক ভালবাসার নাম। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। শত রাগ,গাম্ভীর্য ও শাসনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কোমল, স্নেহময় রূপ,বাবা।

আমার বাবা ফজলুল করিম। বাবা ছিলেন প্রাক্তন প্রথম শ্রেণীর অনারারি ম্যাজিষ্ট্রেট, চেয়ারম্যান, প্রধান শিক্ষক, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ। অতি সম্প্রতি আমি বাবাকে হারিয়েছি। যার অভাব কোনদিন পুরন হবে না। আমার প্রতিটি ফেলে আসা দিনের সাথে জড়িয়ে আছে বাবার স্মৃতি। বাবাকে হারানোর বেদনা প্রতিটি সন্তান মাত্রই বুঝতে পারেন।

বাবা ছিলেন আমার অভিভাবক, শিক্ষক, সিনিয়র ও অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। আমার সুখ দুঃখের অংশীদার। পৃথিবীতে আমার সবচাইতে প্রিয় মানুষ। ২৭ই জুলাই ২০১৯ইং বাবা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বাবার সাথে আর কখনো দেখা হবে না, একথা ভাবতেই কষ্টে গা শিউরে উঠে।

আমার আইন পেশায় হাতেখড়ি বাবার হাতেই। আমি যখন নবীন আইনজীবি, তখন আমার কোন সিনিয়রই ছিল না। সিনিয়র ছাড়া আইন পেশায় টিকে থাকা কত যে কঠিন, তা কেবল নতুন একজন আইনজীবিই বুঝতে পারেন। সেই দুঃসময়ে বাবা এগিয়ে এসেছিলেন প্রিয় ছেলের ক্যারিয়ার গঠনে। বাবা হাতে কলমে পরম যত্নে আমাকে জেরা -জবানবন্দি, সাবমিশন ও জেরার কলাকৌশল শিখিয়েছেন। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, বাবা আইনজীবি ছিলেন না। কিংবা আইনের ছাত্রও নয়। তবে বাবা পাঁচ বৎসর প্রথম শ্রেনীর অনারারি ম্যাজিষ্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন। ফলে ফৌজদারি আইনে বাবার দখল ছিল অভূতপূর্ব। বাবার কারনে আমার অমসৃণ চলার পথ হয়েছে, সহজ ও সাবলীল।

মাধ্যমিকে আমি ছিলাম ডানপিটে। পড়ালেখায় ভীষণ অমনোযোগী। খারাপ ব্ন্ধুদের পাল্লায় পড়ে পড়ালেখা ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমার সেই সংকটময় মুহুর্তে আবারও বাবাই ত্রাণকর্তা হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। আমাকে টেনে তুলেছিলেন ধ্বংসস্তুপ থেকে। কল্পনার ফিনিক্স পাখির মত পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন। প্রিয় ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে পাড়ি দিয়েছিলেন সুদুর টেকনাফে। নিজের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতে জলাঞ্জলী দিয়ে। বাবার প্রাণান্তকর চেষ্টায় আমি পড়ালেখায় হয়েছি, মনযোগী। ফিরে আসি শীর্ষস্হানে। বাবার এ অবদান, আত্মত্যাগ কখনো ভোলার নয়।

বাবা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত, মার্জিত। বাবার বাগ্মিতা ছিল বিস্ময়কর। আর বাবার সম্মোহন ক্ষমতা ছিল অপ্রতিরোধ্য। এ কারনে বাবা বিপুল মানুষের নিকট ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিলেন। বাংলা ও ইংরেজী দুই ভাষাতেই বাবা ছিলেন সমান পারদর্শী। ফলে মানুষের মাঝে বাবাকে নিয়ে ছিল বিস্ময়, কৌতুহল ও মুগ্ধতার ছড়াছড়ি। আর এ কারনেই বাবা জীবিতকালেই পরিনত হয়েছিলেন কিংবদন্তিতে।

জেলার শীর্ষস্হানীয় শিক্ষাবিদ ছিলেন,বাবা। টেকনাফ পাইলট হাইস্কুল, সৈকত গার্লস হাইস্কুল, প্রিপ্যারেটরি উচ্চ বিদ্যালয়, রামু গার্লস হাইস্কুল,আমেনা খাতুন গার্লস হাইস্কুল সহ বাবা বহু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। এসময় প্রচুর মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে বাবা বিনা বেতনে পড়িয়েছেন, আর্থিক সাহায্য করেছেন। আর আলোর ফেরিওয়ালা হয়ে সারা জীবন জ্ঞানই বিতরণ করেছেন। বাবা ছিলেন আপাদমস্তক এক মহান শিক্ষক। পেশার বিভিন্নক্ষেত্রে বিচরন করলেও বাবা শিক্ষক পরিচয়েই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

আশির দশকে আমার বাবা ছিলেন শীর্ষ রাজনীতিবিদ। তদানীন্তন ক্ষমতাসীন দলের জেলায় শীর্ষব্যক্তি। ছিলেন ভারুয়াখালী, বৃহত্তর চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের একাধিক বার চেয়ারম্যান। ৭৭ইং থেকে ৮১ ইং পর্যন্ত প্রথম শ্রেনীর অনারারি ম্যাজিষ্ট্রেট। চাইলেই বাবা অনেক অর্থবিত্তের মালিক হতে পারতেন। কিন্তু বাবা ছিলেন, আমৃত্যু সৎ,স্বচ্ছ ও নির্লোভ। বাবা চলে গেছেন, কিন্তু বাবার আদর্শ ও সততা চিরকাল বেঁচে থাকবে। সততা, স্বচ্ছতার যে দীক্ষা ও দৃষ্টান্ত বাবা রেখে গেছেন, তার ধারাবাহিতা রক্ষা করাই আমার চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমি পিছপা হব না।

ভাবতে কষ্ট হয়,বাবা আর আমাদের মাঝে নেই। পরম স্নেহে কেউ আর নাম ধরে ডাকবে না। বাবা ছাড়া আজ স্মৃতি গুলি মলিন। স্বপ্নগুলো ধুসর, ঝরা পাতার মত। হৃদয়ে রক্তক্ষরন হয় প্রতিনিয়ত। আনমনে রক্ত অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে। চারদিকে কেবলই শূন্যতা। আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা।

বাবা নেই। কিন্তু স্মৃতির মণিকোঠায় বাবা চিরঅম্লান। বাবা অনাবিল শান্তিতে শায়িত থাকবেন, এ যেন হয় আমার প্রতিদিনের প্রার্থনা।
সবাইকে ধন্যবাদ।

লেখক: সাজ্জাদুল করিম, সিনিয়র আইনজীবী, কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আমার কক্সবাজার অনলাইন এবং আমার কক্সবাজার-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

 


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ২৫২