৪৭৪ মিনিট আগের আপডেট; দিন ৯:১৩; রবিবার ; ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

ভারী বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৭ জুলাই ২০২১, ২১:৪৮

গত ৩দিন ধরে অব্যাহত ভারী বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চল। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার।ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে জনদুর্ভোগ প্লাবিত এলাকার গবাদি পশু, ধান, পানের বরজ, বর্ষাকালীন শাকসবজি ও বিভিন্ন জাতের ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। 

টানা বৃষ্টিপাতে এখন পর্যন্ত পাহাড় ধ্বসে ৫ রোহিঙ্গাসহ ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় আছে। 

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান বলেন, বঙ্গোপ সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে কক্সবাজারে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। কক্সবাজারে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত অব্যহত আছে। 

গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ১১৭ মিলিমিটার। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতি আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার উপকূলে ফিরেছে বেশি মাছ ধরার ট্রলার।

জেলেরা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে সাগর উত্তাল হওয়া ও বাতাসের বেগ বেড়ে যাওয়ায় সাগরে মাছ শিকার না করে উপকূলে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন তারা। 

নুনিয়ারছড়ার এলাকায় কথা হয় জেলে মো: করিম বলেন, সাগরে মাছ ধরা বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন কিন্তু হঠাৎ তারপরও শঙ্কা নিয়ে সাগরে গেছিলাম। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি।  

কুতুবদিয়া পাড়ার আকবর আলী মাঝি জানান, বন্ধের সময় চরম কষ্টে দিনাতিপাত করেছি। নিষেধাজ্ঞা শেষে ভেবেছিলাম হয়তো কয়েকদিন সাগরে মাছ ধরে দেনা পাওনা পরিশোধ করবে।  কিন্তু তা আর হল কই বিরূপ আবহাওয়ার সাগরে মাছ শিকার গিয়েও ফিরে আসতে হল। তিনি আরো বলেন, বন্ধের সময়ে সরকার থেকে যা চাল পেয়েছি তা দিয়ে কি আর সংসার চলে। 

উপকূলের কথা হয় ট্রলার মালিক নুরুল আবছার বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধের ট্রলার পানিতে থাকায় বেশ কিছু অংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।ভেবেছিলাম এবার দীর্ঘদিন পর সাগরে ট্রলার মাছ ধরতে যাবে সব প্রস্তুতি শেষ করেও শেষ পর্যন্ত সাগরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় বৈরী আবহাওয়া কারণে জেলেদের যাওয়া হল না। 

প্রবল বর্ষণে কক্সসবাজারে অধিকাংশ নিম্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তারমধ্যে উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, মহেশখালী। এসব এলাকার অন্তত শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। 

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়া টেকনাফ আশ্রায় নেয়া বেশ কয়েকটি শরণার্থী শিবির। এসব শিবিরের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ঘর-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। রাস্তার বেহাল দশায় বৃষ্টিপাতে জন ও যান চলাচলে দুর্ভোগের মাত্রা আরও বেড়েছে। পাহাড় কাটা বন্ধে জেলা প্রশাসনের আপ্রাণ প্রচেষ্টা ভেস্তে দিচ্ছে পাহাড় খেকোরা।

অন্যদিকে কক্সসবাজার শহরে প্রশাসনকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লাইট হাউজ এলাকার ফাতের ঘোনা, সৈকত পাড়ার ৫১ একর সংলগ্ন বাঘঘোনা, ঘোনার পাড়া, বৈদ্য ঘোনা,পাহাড়তলী, ইসলামাবাদ, বাদশাঘোনা, ইউছুফের ঘোনা, সাহিত্যিকা পল্লী, বিজিবি ক্যাম্প এলাকা, বাস টার্মিনাল, আদর্শগ্রাম, উত্তরণের আশপাশ ও জেলগেইট এলাকায় এখনও নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। 

গত ৩ দিনের টানা বৃষ্টিপাতে এসব এলাকায় পাহাড় ধসের শঙ্কা করছে স্থানীয়রা। এতে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে। তাই পাহাড় কাটার স্থান চিহ্নিত করে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সুশীল মহল।

এদিকে ভারী বর্ষণের কারণে মহেশখালী নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে রয়েছে। আউশ ও আমন ধানের জমিতে জমে গেছে পানি। এতে হতাশা দেখা দিয়েছে কৃষকদের মাঝে। চকরিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের এলাকা বৃষ্টিপাতে
জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। 

উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ থেকে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। বর্ষকালীন সবজি চাষ নিয়ে এখানকার কৃষকরা। তাছাড়া ধান ক্ষেতে পানি জমে থাকায় নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে।

কুতুবদিয়া ও পেকুয়া উপকূলীয় এলাকা বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে বিভিন্ন এলাকায়। এতে নিচু এলাকাগুলো পানির নিচে রয়েছে। চিংড়ি ঘেরে পানি প্রবেশ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান চাষীরা। 

টেকনাফ, উখিয়া, রামু ও সদর উপজেলার কৃষকদের মন ভাল নেই। এসব উপজেলার নিম্নাঞ্চল এখন পানিতে ভরপুর। বাড়ি বাড়ি পানি ঢুকে মূল্যবান মালামাল নষ্ট হওয়ার উপক্রম সৃষ্টি হয়েছে। আউশ ও আমন ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় এখানকার কৃষকেরা। কষ্টে রোপিত ধান নষ্ট হলে সব স্বপ্ন ভেস্তে যাবে তাদের।

উখিয়ার কুতুপালং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, গত সোমবার থেকে টানা বৃষ্টিপাতে কুতুপালংয়ের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে কুতুপালং বাজারের একাংশ, পূর্ব পাড়া, পশ্চিমের বিল পানিতে ডুবে রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সাথে লাগানো কাটাতারের বেড়া ও গাইডওয়াল ধসে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে এসব এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে।

অতিরিক্ত ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. শামসৌদ্দজা নয়ন বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে কিছু ক্যাম্প প্লাবিত হয়েছে। তবে কয়টি ক্যাম্প প্লাবিত হয়েছে তা জানতে সময় লাগবে। বিচ্ছিন্ন কিছু পাহাড় ধসের ঘটনাও ঘটেছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, উপজেলার হোয়াইক্যং, হ্নীলা, সাংবারাংয়ের বেশ কয়েকটি গ্রামের অন্তত সাত শতাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। 

তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস কারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে যেতে প্রশাসনের মাইকিং অব্যাহত রয়েছে।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনে সদস্য সচিব এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন,অপরিকল্পিত ভাবে ড্রেইন-রাস্তা নির্মাণ, সংস্কার না করা, নালা-রাস্তা ও বাকঁখালীর পাড়া দখলসহ নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে বৃষ্টি হলে প্লাবিত হয় সর্বত্র। 

দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলে আসলেও প্রতিকারে মাথা ব্যথা নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। যার ফলে বার বার সাধারণ মানুষই কষ্ট ভোগ করছে।

কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন,বিশ্ব ব্যাংকের অনুদানে কক্সবাজার পৌরসভার সকল ড্রেইন নতুন ভাবে নির্মাণ হচ্ছে। কাজ শেষ হলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে।


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ১২৬