৩৮৪৭ মিনিট আগের আপডেট; দিন ৯:৪৩; রবিবার ; ১৩ মে ২০২১

'লেখকের ন্যায্য মজুরি'

সাইফুল্লা সাদেক ০১ মে ২০২১, ১৭:৫৯

'লেখাটি লিখে দিন দয়া করে'! 
-যারা লেখালেখির সাথে জড়িত তাদের কাছে এমন অনুরোধ নিত্যদিনের। কোনো না কোনো দিক থেকে এমন অনুরোধ আসতে থাকে। কম করে হলেও দৈনিক দুই-তিনটার আবদার তো আসেই। অনেক সময় কোনো গণমাধ্যম বা সাময়িকী থেকে বলা হয়, 'আপনার একটি লেখা দেন, প্রকাশ করতে চাই'। অনেক দিক থেকে আবার লোভাতুর প্রস্তাব আসে এভাবে, ‘লিখুন, লিখুন। নিজের নামে লিখুন। প্রকাশ করুন। পরিচিতি পেতে হবে তো’!

এইতো গেলো প্রাতিষ্ঠানিক আবদার ও অনুরোধ। ব্যক্তিগত অনুরোধের কথা কি ফেলা যায়?  কেউ কেউ অনুরোধ করেন, কষ্ট করে একটি লেখা লিখেছি। আমার লেখাটি একবার পড়ে দিন। সম্পাদনা করে দিন! ফেসবুকে প্রকাশ করবো বা পত্রিকায় পাঠাবো’!
অপরের কথা কিই বা বলবো, আমি নিজেও প্রায় সময় এ কাজটি করেছি বা মাঝে মধ্যে করি। অনেক সময় অনেক কাজের চাপে পড়ে ও জরুরি প্রয়োজনের কারণেই করতে হয়।

তবে আমি খুব কাছের ও পরিচিত জনদের দিয়ে করাই। অবশ্য, যাদেরকে কোনো না কোনোভাবে সহযোগিতা করতে পারবো, এমন মানুষকেই আমি এক্ষেত্রে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। অনেক সময় অনেককে মূল্যায়ন করতে পারি, আবার অনেককে সেভাবে পারি না। তবে তাদেরকে যে মূল্যায়ন করতে হবে বা করার প্রয়োজন  ছিলো ও আছে, এই বোধটুকু আমি ধারণ করি। বিনা পারিশ্রমিকে দিয়ে কাজ করাতে খারাপ লাগে! বিবেকে বাঁধে।

প্রায় সময় আমি নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি। আচ্ছা লেখালেখি কি এতোটাই সস্তা বা সহজ, লেখাটি লিখো-বললেই কি হয়ে যায়?
একটি লেখা পাঠযোগ্য করে তোলা কতোটা কঠিন ও শ্রমের তা যারা লিখেন, তারা জানেন ও বুঝেন। কতোটা কাঠখড় পোহানোর পর তবে একটি সুপাঠ্য লেখা প্রস্তুত করা হয়, তা একমাত্র লেখকই বুঝতে পারেন। একমাত্র স্রষ্টাই বুঝতে পারেন তার সৃষ্টির মূল্য!
তাহলে লেখালেখির পরিশ্রম ও তার মূল্যের হিসাব কষা যাক-

লিখতে বসার আগে একজন লেখককে উপযুক্ত সময়, পরিবেশ ও শান্ত-সুস্থ মন-মেজাজ নিয়ে প্রস্তুত হতে হয়। তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ঠিক করে নিতে হয়। লেখকের বসার মত পরিবেশ বা একটি জায়গা লাগে। দরকার হয় পর্যাপ্ত আলো, বাতাস। তার মানে আছে বিদ্যুৎ খরচ।
প্রয়োজন হয় খাতা-কলমের। আচ্ছা বাদ দিলাম। তা প্রাচীন জিনিস। আজকাল অনেকেই সরাসরি পিসি/ল্যাপটপ বা ফোনেই লিখে ফেলেন। তার মানে প্রয়োজন পড়ছে আরো দামি জিনিস-পিসি/ল্যাপটপ/স্মার্টফোনের। সেই লেখা টাইপিং করার। এসবের মূল্য কতো?

শুধু ই-ডিভাইস থাকলেই কি চলে? এসব ডিভাইস চলবে কীভাবে? ইন্টারনেট লাগবে না? মোবাইল ডাটা বা ওয়াইফাই? অবশ্যই দরকার। আর লেখা পাঠাতে হয় মেইলে। মেইলেও এখন অনেক সংকট তৈরি হয়। যারা প্রচুর মেইল আদানপ্রদান করেন, তাদের স্টোরেজ শেষ হয়ে যায় দ্রুত। ১৫ জিবি হয়ে গেলে ডলার খরচ করে স্টোরেজ কিনতে হয়। অন্যথায় লেখা আসবে না, যাবেও না। বড্ড ঠেকার ঠেকা! আমি নিজেও সে সংকটে ভুগছি! দুই দুটা মেইল আইডিতে স্টোরেজ কেনার ন্যায্য দাবি উঠেছে গুগল থেকে!
ওকে, ঠিক আছে। সবকিছুই প্রস্তুত! কিন্তু, যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে লিখবেন, তা কি এমনি এমনি লেখা সম্ভব? রেফারেন্সের জন্য কোনো না কোনো বইপত্র দরকার, আর্টিকেল সংগ্রহ করতে হবে। তাই না?   কেউ একটা লেখা লিখতে বললেন, সব লেখার রেফারেন্স পাওয়ার মতো বই লেখকের সংগ্রহে নাও থাকতে পারে। তাহলে বই যোগানের ব্যাপার থেকেই যায়। বইয়ের বাজারে ঘুরো এবার। কিংবা নেট দুনিয়া সার্চ করো!

এবার আসা যাক, কিছু জৈবিক বিষয়ে। একজন লেখক যখন লিখতে বসেন, তার সাধারণ কিছু খাবার দাবারের কথাও তো ফেলে দেয়া যায় না। চা-নাস্তা, পানি! হালকা খাবার। পেট তো চলতে হবে। পেটে ক্ষুধা থাকলে মাথা কাজ করে না। আবার যেসব লেখকের পান-সিগারেটের অভ্যাস আছে, তাদের হিসাবটা?

এই পর্যন্ত একটি লেখা তৈরির বেকগ্রাউন্ড বা প্রস্তুতি সম্পর্কে বললাম শুধু। এবার  সূচনাতে যাওয়া যাক....!
যেহেতু লেখালেখির বাজারে মূল্য সংকট। বেগার খাটুনি ছাড়া তেমন কিছুই নেই। তাই একজন লেখককেও চাকরি করতে হয়। অথবা একজন লেখক পড়ালেখা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীও হতে পারেন। লেখককে হয়তো ৮-১০ ঘণ্টার অফিস করতে হয়। অথবা শিক্ষার্থী হিসেবে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, ক্লাসটেস্ট, পরীক্ষা ইত্যাদি সম্পন্ন করতে হয়। এসব কিছু সম্পন্ন করার পর তাকে বের করতে হয় সে বিষয়ে পড়া ও লেখালেখির সময়। এরপর অতিরিক্ত সময় ও শ্রম ব্যয়ের মনোযোগ স্থির করতে হয়। আবার লেখায় শ্রম বিনিয়োগের কথা ভাবলেই শুধু চলে না। সারাদিন অফিস করে বা ক্লাস করে লেখকের মেধাশক্তি ঠিকঠাক কাজ নাও করতে পারে। এই অবস্থায় মনের মাধুরী মেশানো লেখা বের হবে কিনা তাও ভাবতে হয়। যাবতীয় দিক ভেবেচিন্তে লেখক প্রস্তুত হন লেখার জন্য।

এখানে এসে লেখক শুরু করলেন লেখালেখির পরিকল্পনা। জীবনের প্রতিটি কাজ শুরুর আগে প্রয়োজন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। লিখতে বসার ক্ষেত্রেও তা দরকার পড়ে।
এবার আসে লেখার বিষয় নির্বাচন, কাঠামো ঠিক করা বা নকশা প্রস্তুতকরণ ও শ্রুতিমধুর শিরোনাম বাছাইকরণের পর্ব। আসে তথ্যসূত্র সংগ্রহের পালা। ইট-সিমেনট-বালু-রড সংগ্রহ হলো। এবার দিতে হবে ভিত্তি! একটি লেখানিভবন গড়ে তোলার জন্য সমস্ত উপকরণ একত্রিত করে লেখক শুরু করলেন তার কাজ।

বর্ণের সঙ্গে বর্ণের, শব্দের সঙ্গে শব্দের এবং বাক্যের সঙ্গে বাক্যের সম্মিলন ঘটানো হলো শুরু। এ যেন একটি বাড়ির ভিত্তি তৈরি এবং সিমেনট-বালু আর ইটের গাঁথুনি! লিখছেন তো লিখছেন লেখক। মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলেন। অলসতা পেয়ে বসে।  ঘুম এসে পড়ে। আবার জেগে উঠেন। ফের করেন আরম্ভ। সেখানেও বিপত্তি। হঠাৎ লেখার প্রসঙ্গ ঘুরে যায়। মূল বিষয় থেকে অন্যদিকে মোড় নেয় গল্প। শব্দে-বাক্যে ভুল হয়ে যায়। মুছে দিতে হয় পূর্বের বাক্যগুলো। ভাঙতে হয় শব্দ। আবার চলে গাঁথুনি। আবার চলে পিচঢালাই!

লেখাটি শ্রুতিমধুর করে তুলতে হয়। পাঠক ধরে রাখতে হবে তো। একটু রসবোধ না হলে হয় না। নিয়ে আসো রসবোধ। কিন্তু  সব সময় রসবোধও কি আর পাঠকেরা খায়? দরকার হয় হালকা ট্রাজেডি, একটু বিরহ- বিয়োগ, একটু রোমাঞ্চ, প্রেম-বিরহ, হৃদয়ের ভাঙা-গড়া। প্রেম যেহেতু আছে, চলে আসে কিছুটা কূটগীরি, কিছুটা পলিটিকসের ভেতর রাজনীতি, সামাজিক বৈষম্য-বঞ্চনা, অর্থনৈতিক চাওয়া-পাওয়া। শেষে ফিরতে হয় ভালোবাসার মধুরমিলনে!

এভাবেই লেখার ভেতরে লেখা তৈরি করতে হয়, গল্পের ভেতর গল্প। তৈরি করতে হয় চরিত্র! কত পরিশ্রম, কত মেধা খাটানো, কত চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা, কত ভাঙা-গড়া! এতা এতো সংগ্রামের বিনিময়ে তৈরি হয় একটি লেখা। গড়ে উঠে লেখনিভবন!
এখানেই কি শেষ? সেই লেখাতে আবার থেকে যায় বানান ভুল। বাক্যে ওদিক সেদিক। ডাবলস্ট্যান্ড। বাংলার সঙ্গে ইংরেজির সংমিশ্রণ। ণ-ষ-ত্ব বিধি থেকে শুরু করে ব্যাকরণগত ত্রুটি-বিচ্যুতি। এবার করতে হবে এডিট বা সম্পাদনা। লেখার সম্পাদনা মানে হলো, বিল্ডিংয়ের ডেকোরেশন। শুধু ইট-সিমেন্ট-বালু-রডের গাঁথুনিতে অট্টালিকা  তৈরি করলেই চলে না। তার দরকার পড়ে সুসজ্জিতকরণ। বাড়িটিকে করে তুলতে হয় দর্শনীয় করে। রং করানো, টাইলস বসানো থেকে শুরু করে আরো কত কী!
একইভাবে একটি লেখা লেখার পর প্রয়োজন হয় সম্পাদনার। একবার নয়, দুবার নয়। কয়েকবার সম্পাদনা করতে হয়। এরপরও ‘কয়লা ধুলে ময়লা যায় না’ অবস্থা! যতো পড়বেন ততো ভুল বের হবে। সবশেষে একটি অবস্থানে আসা যায়। এতো পরিশ্রম শেষে লেখাটি প্রকাশের যোগ্য হয়ে ওঠে। প্রকাশিতও হয়।  

এবার আসে নতুন চ্যালেঞ্জ। আসে পাঠকের সমালোচনা। অনেকে আবার না পড়েই সমালোচনা করেন। ‘ধূর ছাই লিখেছেন- বলে ছুড়ে ফেলেন ডাস্টবিনে! অনেকে গর্ব নিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, এসেছে নব্য লেখক, কিসব বস্তাপচা লেখা লিখে’! 
সামনে আসে লেখকে লেখকে প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব, সংঘাত, ঈর্ষা-হিংসা-বিদ্বেষ! আহা! লেখালেখি-তুমি কতো সংগ্রামের ফসল!
এতো কিছুর পরও কথা হলো, কেউ না কেউ লিখছেন। যদি গভীরভাবে গবেষণা ও জরিপ পরিচালনা করা যায়, দেখা যাবে শিক্ষিত সমাজের ১০০ শতাংশের মাঝে মাত্র ২ শতাংশ পাবেন লেখালেখির যোগ্য বা দু’কলম লিখতে জানেন বা লেখার চেষ্টা করেন। এনিয়ে অনেকের মতভেদ থাকতে পারে। সে মতভেদ স্বীকার করে নিয়ে বলতে পারি, এই ২ শতাংশ লেখকের কদরও পুঁজিবাদী সমাজে পাওয়া যায় না। 

সিঙ্গাড়া, সামুচা, পেঁয়াজুর মূল্য আছে, একটা শসা, গাঁজর, বেগগুনের কত গুণ, চড়া দাম, চায়ের পেকেটের মূল্য কত! এসব দৃশ্যমান খাবার। মানুষ খায়। পেট ভর্তি করে। মানুষ ভাবে, লেখা তো কেউ খায় না। তাই এর অর্থমূল্য নেই। উদরপুর্তির সমাজে সবকিছু কাঁচামাল হতে পারলেও মানুষের সর্বোচ্চ মেধাশ্রমের বিনিময়ে গড়ে ওঠা লেখালেখির ন্যায্য মূল্য দাঁড়াচ্ছে  না।  একজন লেখকের লেখা নিয়ে কত ইতিহাস তৈরি হয়ে যাচ্ছে, কত নাটক-সিনেমা তৈরির মাধ্যমে কোটি কোটি,-মিলিয়ন-বিলিয়ন আয় করে ফেলছেন কতজন! কিন্তু লেখক পড়ে থাকেন ইতিহাসের অবহেলিত খাতায় কিংবা আস্তাকুড়ে! হয়তো কেউ কেউ মূল্য পান, তাও কারো করুনায়, অবহেলায় ও অনিচ্ছায়! 

তবুও লেখক লিখে চলেন। লেখকের হাত ধরে তৈরি হয় ইতিহাস। লেখকের কাজ লেখক করে চলেন। লেখকের লেখা অমূল্য। লেখকের কাজ সমাজ পরিবর্তন করা। বিপ্লব সৃষ্টি করা! 
পৃথিবীর সকল লেখকের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা! 

 

১ মে, ২০২১

ঢাকা, বাংলাদেশ!


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ৭৩