১১ মিনিট আগের আপডেট; রাত ৩:০৯; রবিবার ; ০৭ মার্চ ২০২১

মাতৃভাষা ও ভাষা শহীদ সম্পর্কে ইসলামের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য

আবুল মাসরুর ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:০৩

ইসলাম ঘোষণা করেছে, মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সৃষ্টিগত তথা জন্মগত অধিকার। কারণ মহান আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সাথে সাথে তাকে তার ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন :‘‘দয়াময় আল্লাহ্। তিনিই শিক্ষা দিয়াছেন কুরআন। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ। তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।’’ এ আয়াতে মানব সৃষ্টির সাথে ভাষা শিক্ষার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। এটির কারণ হলো ভাষা মানুষ সৃষ্টির একটি অবিভাজ্য বিষয়। যে ভাষার মাধ্যমে পরস্পরে ভাব বিনিময় করবে, সে ভাষাই হবে পরস্পরের সম্পর্কের সেতুবন্ধন।

 মানুষের ভাষা মহান আল্লাহ্ তা‘আলার একটি বিশেষ নি‘আমত। আর মানুষের এ ভাষা কৌশল আল্লাহর ইচ্ছাকৃত সৃষ্টি। এ জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা আদম আ.কে সৃষ্টির সাথে সাথেই তাঁকে ভাষাজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা ঘোষণা করেন : ‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সেই সমুদয় ফিরিশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন : ‘এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ তারা বলল : ‘আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ব্যতীত আমাদের তো কোনো জ্ঞানই নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়।’ তিনি বললেন : ‘হে আদম! তাদেরকে এই সকল নাম বলে দাও।’ সে তাদেরকে এ সকলের নাম বলে দিলে তিনি বললেন : ‘আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্বন্ধে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা ব্যক্ত কর বা গোপন রাখ আমি তাও জানি?’’’

আলোচ্য আয়াতের ‘‘আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন অংশ দ্বারা পৃথিবীর সকল ভাষাকে বুঝানো হয়েছে।

প্রত্যেক দেশের মানুষের সাথে ঐ দেশের মাতৃভাষার আত্মার সম্পর্ক বিদ্যমান। ইসলামও এ বিষয়টির প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করেছে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সত্ত্বাগত ও স্বভাবজাত তথা জন্মগত মৌলিক অধিকার। শুধু মৌলিক অধিকারই নয়। 

এটি মৌলিক অধিকার জরুরী অবস্থায় রাষ্ট্র কর্তৃক স্থগিত ঘোষিত হতে পারে; কিন্তু ভাষা এমন ধরনের অধিকার যা কখনো হস্তক্ষেপযোগ্য নয়। আর এটি করলে মানবসৃষ্টির কাঠামোতেই হস্তক্ষেপ করা হবে, তার অস্তিত্ব ও সত্ত্বাকে অস্বীকার করা হয়। 

সুতরাং এ যদি হয় ভাষা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, তাহলে তা ব্যবহার করার অধিকার আদায় আন্দোলনে নিঃসন্দেহে কোনোরূপ বাধা প্রদান করে না। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলন অধিকার আদায়ের আন্দোলন। 

আর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করতে ইসলাম বিভিন্নভাবে মানবজাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে।

অধিকার আদায়ের জন্য ইসলামে যুদ্ধের প্রয়োজন হলে যুদ্ধ করে অধিকার আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন : ‘‘যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করতে সম্যক সক্ষম।’’

আর এ অধিকার আদায় করতে যেয়ে সংঘর্ষ হলে তাতে যদি কেউ মারা করে তাহলে তাকে শহীদের মর্যাদা দেয়া হবে। কিয়ামতে যার প্রতিদান হবে জান্নাত। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, ‘‘যায়িদ ইব্ন ‘আলী ইব্ন হুসাইন তার পিতা থেকে তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করে বলেন : কোনো নিপীড়িত অধিকার বঞ্চিত (মুসলিম) নিজের অধিকার তথা হক আদায়ে যুদ্ধ করে নিহত হলে সে শহীদ।’’

অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে যে, সত্যের পথে, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ও অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করাই সর্বোত্তম জিহাদ। এ প্রসঙ্গে রাসূল সা. বলেন: ‘‘আবূ সা‘ঈদ আল-খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন : অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক তথা সঠিক কথা বলা অর্থাৎ ন্যায় অধিকার প্রদান করার স্পষ্ট দাবী করাই শ্রেষ্ঠ জিহাদ।’’

মাতৃভাষার প্রতি প্রত্যেক ধর্মের একটি আলাদা অনুপ্রেরণা রয়েছে। আল-কুরআন আরবী ভাষায় এবং শেষ নবী সারা বিশ্বের মানুষের নবী আরবী ভাষাভাষী, সেহেতু সারা বিশ্বের মানুষের ভাষা হবে ‘আরবী। তাদের মাতৃভাষা ত্যাগ করে শুধু ‘আরবী ভাষায় কথা বলতে হবে। ইসলাম কখনও এমন কথা বলে না। 

এর সমর্থনে প্রমাণস্বরূপ কুরআন ও হাদীসে অনেক দিক পাওয়া যায়। যেমন : ইসলাম সারা বিশ্বের মানুষের মাঝে ভাষার বিভিন্নতা ও বৈচিত্রতাকে স্বীকার করে নিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে, এ বৈচিত্রতা মানুষের হাতে গড়া নয়। এটি আল্লাহ্ তা‘আলারই সৃষ্টিকুলে এক রহস্যময় নিদর্শনস্বরূপ। 

কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন : ‘‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর অন্যতম নিদর্শন হলো আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণে বৈচিত্রতা। নিশ্চয়ই এতে পৃথিবীবাসীর জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।’’


সর্বমোট পাঠক সংখ্যা : ৮৭